09/09/2025

মেঘের দেশে একবেলা

Engr. Md. Shahjahan Alam

এক সকালে প্লেন মিস করলেন লেখক, কিন্তু সেই মন খারাপই জন্ম দিল এক নতুন অভিজ্ঞতার। ঢাকা থেকে নীলফামারীর সৈয়দপুরে প্লেনের জানালা দিয়ে তিনি দেখলেন মেঘের এক ভিন্ন জগত। সাদা মেঘের ভেলা আর রোদ-বৃষ্টির খেলায় মেতে ওঠা প্রকৃতি যেন তাকে মুগ্ধ করে তুললো প্লেন থেকে দেখা মেঘের সেই মনভোলানো দৃশ্যই তাকে ভাবতে বাধ্য করল মেঘ আসলে কী , আর সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নিল মেঘের বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক রহস্য নিয়ে এই লেখা

মেঘের দেশে একবেলা

এই প্রথম সৈয়দপুর এলাম। এটি নীলফামারী জেলাতে পড়েছে। ইউএস বাংলার একটা ফ্লাইটে ঢাকা থেকে সৈয়দপুর। আজ প্লেনে কোনো সিট ফাঁকা নেই, প্লেন ভরা যাত্রী। আমার সিট একেবারে শেষের লাইনে জানালার পাশে, বাম পাশে আমার সহযাত্রী ইঞ্জিনিয়ার মনির। যথাসময়ে প্লেন উড্ডয়ন করল ঢাকা থেকে। জানালার পাশে বসে বাইরের অসীম-অকৃত্রিম আকাশমণ্ডল দেখছি। হঠাৎ কেন জানি আজ দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো মেঘমালার দিকে। এখন শরৎকাল। ঢাকাতে সকালে রোদ-বৃষ্টির খেলা দেখেছি- এই রোদ, এই বৃষ্টি। প্লেনে বসে আকাশে ভেসে থাকা শুভ্র সাদা রঙের বিভিন্ন আকৃতির মেঘমালা দেখছি। সূর্যের আলোতে তা চকচক করছে। মেঘ আসলে কী? আগে পাঠ্য পুস্তকে পড়েছি কিন্তু আজকের মতো এত চিন্তা করিনি, প্রশ্ন জাগেনি মনে। বলা যায় আজকে মেঘের সাথে আমার সেই মিতালি, বন্ধুত্ব।

পানি চক্রের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মেঘ। এটি হলো পানির এক রূপ- অতি ক্ষুদ্র পানি কণা। বৃষ্টির ফোঁটা থেকে অনেক অনেক গুণ ক্ষুদ্র যা বায়ুমন্ডলের ধুলিকণার সাথে মিশে আকাশে ভেসে বেড়ায়। সূর্যের তাপে ভূ-উপরিভাগের পানি বাষ্পায়িত হচ্ছে। অতি হালকা এই জলীয় বাষ্প বাতাসের অংশ হিসাবে বায়ুমন্ডলে আসছে। বাতাস কেন আসছে উপরে? চাপের পার্থক্যের কারণে। আমরা বিজ্ঞান পড়ে এই নীতিমালা জেনেছি যে, বায়বীয় উপাদান বেশি চাপের জায়গা থেকে কম চাপের জায়গাতে যাবে, পানি উপর থেকে নিচে পড়বে, তাপশক্তি বেশি তাপমাত্রার জায়গা থেকে কম তাপমাত্রার দিকে যাবে, বিদ্যুৎ বেশি ভোল্টেজ লাইন থেকে কম ভোল্টেজ লাইনে যাবে- এটাই নিয়ম, তাইনা? বায়ুমন্ডলে এসে এই বাতাস যখন ঠান্ডা হচ্ছে তখন বাতাসের ঐ জলীয় বাষ্প ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত হচ্ছে। পরে তা আরও একীভূত হয়ে মেঘে রূপান্তরিত হচ্ছে। এই মেঘ বাতাস দ্বারা তাড়িত হয়ে আকাশের এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটছে। প্লেন থেকে দেখে মনে হচ্ছে তারা খুবই ব্যস্ত, এক সুনির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছতে হবে এখনই। এক সময় তা আরও ঘনীভূত হয়, ভারী হয়ে যায়। ফলে আর ভাসতে পারে না তখন ঝরে পড়ে। এটাই বৃষ্টি। পড়ার পথে আরও ঠান্ডা হলে তা শিলা বা তুষার হিসাবে পড়ছে। রহস্যে ঘেরা সব আয়োজন। আকাশে এক অতি সূক্ষ্ম ও পরিকল্পিত তাপ বিজ্ঞানের খেলা চলছে। কে এই বিজ্ঞানী? আচ্ছা, এই বাতাস কোথা থেকে এল? এটা কি শুধুই প্রাকৃতিক নিয়ম? নাকি এর পিছনে কোনো মহা প্রকৌশলী আছেন? কোথায়, কখন, কতটুকু বৃষ্টি হবে তার জবাব আমরা জানিনা। কে এই মহা পরিকল্পনাকারী, বন্ধু? তিনি হচ্ছেন আমাদের রব- আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা। তিনি বিজ্ঞানময় মহা গ্রন্থ আল কোরআনের অনেক জায়গায় এ সম্পর্কে বলেছেন। যেমন, আল কোরআনের সূরা রুমের ৪৮ নং আয়াতে কারিমায় আল্লাহ তা’আলা বলেন:

আল্লাহই বায়ু প্রেরণ করেন, তারপর সেই বায়ু মেঘমালাকে সঞ্চালিত করে এবং তিনি সেটিকে যেভাবে চান সেভাবে Deployed করেন আর তোমরা দেখ troposphere এর বিভিন্ন রকম অংশ, এরপর তোমরা যখন মেঘের মধ্যে থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করতে দেখো, তখন তোমরা দেখতে পাও যে, তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তার প্রতি সেই বৃষ্টি বর্ষণ করেন। তারা আনন্দে overflowing হয়ে যায়।

মেঘ তো সাদা। কিন্তু কেন? আবার কেনই বা আমরা একে জমিন থেকে ধূসর বা কালো দেখি? মেঘের উপর যখন সূর্যের আলো পড়ে তখন তা সূর্যের সব তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলোকরশ্মিকে প্রতিফলিত করে, কাউকে ধরে রাখে না। তাই আমাদের চোখে মেঘ সাদা হিসাবে ধরা দেয় অর্থাৎ আমরা মেঘকে সাদা দেখি। আবার মেঘ বায়ুমন্ডলে অনেক স্তরে থাকে। যখন উপরের স্তরের মেঘের ছায়া নিচের স্তরে পড়ে তখন আমরা নিচের স্তরের মেঘকে ধূসর বা কালো দেখতে পাই। আকাশে বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন প্রকারের মেঘ থাকে। যেমন, ভূমি থেকে ২.৫ কিলোমিটার পর্যন্ত নিম্নস্তর, ২.৫ কিলোমিটার থেকে ৬ কিলোমিটার পর্যন্ত মধ্যস্তর আর ৬ কিলোমিটারের উপরে উচ্চস্তর। এই মেঘের আবার বিভিন্ন নাম আছে- ল্যাটিন নাম। ৬ কিলোমিটারের উপরে যে মেঘ তাকে বলে সিরাস, সিরো স্ট্যাটাস এবং সিরো কিউমুলাস। এগুলো সবই উপরের স্তরের মেঘ। সিরাস মেঘ দেখতে ঘোড়ার লেজ বা ঝাটার মতো। এই মেঘে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। সিরো স্ট্রাটাস দেখতে পাতলা চাদরের মতো। সিরো কিউমুলাস হলো গোলাকার স্তূপের মতো, ছোট ছোট ঢেউ আকারে আকাশে উড়ে বেড়ায়। দেখতে মনোরম।

এরপর আছে মাঝারি মেঘ বা মধ্যস্তরের মেঘ। এদের নাম হলো অল্টো কিউমুলাস এবং অল্টো স্ট্রাটাস। অল্টো কিউমুলাসও সিরো কিউমুলাসের মতো স্তূপীকৃত তবে পার্থক্য হলো অল্টো কিউমুলাস সাইজে বড়, দেখতে ধূসর বর্ণের। অল্টো স্ট্রাটাস দেখতে নীল বা ধূসর, সারা আকাশ ছেয়ে থাকে। এই মেঘে বৃষ্টিপাত হয় এবং তা দীর্ঘক্ষণ ধরে চলে।

আর সবশেষ হলো নিচু মেঘ। নিম্বাস, কিউমুলাস, স্ট্যাটাস, নিম্বোস্ট্যাটাস ইত্যাদি এদের অনেক নাম। নিম্বাস বা বাদল মেঘ। এই মেঘ কালো, ভূপৃষ্টের খুব কাছে থাকে। এতে প্রচুর বৃষ্টি হয়। নিম্বোস্ট্যাটাস খুব ঘন, এতে সূর্য দেখা যায় না। এই মেঘে বৃষ্টি হয়, সাথে শীলও পড়ে। আর কিউমুলাস মেঘ গম্বুজ আকৃতির, সূর্যের আলো পড়লে তা দেখা যায়। সাধারণত বৃষ্টি হয় না। আর এক ধরনের মেঘ আছে যার নাম কিউমুলোনিম্বাস। এই মেঘের অবস্থান ৯ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এতে বজ্রপাত হয় বলে একে বজ্রমেঘও বলে। এতে পরিচলন বৃষ্টি হয়, শিলাবৃষ্টি হয়। এই ছিল মেঘ নিয়ে একটু একাডেমিক আলোচনা যা বন্ধু মেঘের জন্য উৎসর্গ করলাম।

মাঝে মাঝে মেঘমালাকে ভেদ করে দেখা যাচ্ছে বড় বড় স্থাপনা, বাড়ী-ঘর, রাস্তাঘাট, নদী-খাল-বিল। পরিষ্কার বোঝা না গেলেও বেশ উপভোগ্য সুবহানাল্লাহ। এই ফাঁকে বিমানের ক্রু এসে নাস্তা দিয়ে গেল। নাস্তা শেষ না হতেই ঘোষণা হলো অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ল্যান্ড করব। এতে মনটা একটু খারাপ হলো, আরও একটু দীর্ঘ হলেই ভালো হতো। দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে প্লেন ল্যান্ড করল। তখন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। নেমেই দৌড় দিলাম টার্মিনালের দিকে। টার্মিনালটি ছোট কিন্তু বেশ পরিপাটি-পরিচ্ছন্ন। নিচতলায় ওয়েটিং লবি, ল্যাগেজ কনভেয়র আর ২য় তলায় দেখলাম বিভিন্ন অফিস-কামরা। মাঝখানে নিচতলা থেকে ২য় তলা পর্যন্ত কিছু অংশ খোলা অর্থাৎ ভয়েড। খোলা এই অংশের উপর স্টীল ট্রাস করে টিনের ক্যানপী (ছাউনি)। এতে সূর্যের আলো এসে পড়ছে ভিতরে। বৃষ্টি ভেজা এয়ারপোর্টের রানওয়ে দেখলাম- অনেক বড় আর আকর্ষণীয় মনে হলো। দেশের অন্য ডমেস্টিক এয়ারপোর্টগুলোও এরকম নিরিবিলি, ঢাকার মতো এতো ব্যস্ত নয়।

আমাদের কোনো ল্যাগেজ নেই। লবিতে গাড়ীর জন্য অপেক্ষা করছি। ইতিমধ্যে ওখানে দেখা হলো ডাঃ টুটুল ভাইয়ের সাথে। অনেক দিন পরে দেখা, প্রায় ত্রিশ বছর। টুটুল ভাই ঢাকা মেডিকেলের ছাত্র আর আমি তখন বুয়েটের। আমাদের পাশাপাশি হল, ক্যাম্পাস। তাছাড়া ছাত্র রাজনৈতিক কারণে আমি তাকে চিনতাম। সে বর্তমানে রংপুর মেডিকেলের মেডিসিন বিভাগের প্রফেসর। এখানে এভাবে তাকে পেয়ে খুব ভালো লাগল। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডাঃ জাহিদসহ অনেক নেতাকে দেখলাম। একই প্লেনে তারাও আসল ঢাকা থেকে। সম্ভবত কোনো দলীয় কর্মসূচী আছে।

এয়ারপোর্টের নাম সৈয়দপুর কিন্তু টার্মিনালের উপরে রক্ষিত সাইনবোর্ডে ইংরেজিতে বড় অক্ষরে লেখা Saidpur. সৈয়দপুরের ইংরেজি বানান কি এরকমই? নাকি ইংরেজদের দেয়া সেই বানান আজও চলছে। আমার কাছে কেন জানি কনফিউজিং মনে হচ্ছে। আমরা সচরাচর সৈয়দের বানান ইংরেজিতে এরকম লিখি না।

ও, আর একটা মজার ঘটনা ঘটেছে আজকে। এটাও আমার আজই প্রথম। সকালে ফ্লাইট মিস করেছি। সকালে আমাদের ফ্লাইট ছিল ৭টা ১৫ মিনিটে আর আমি তা ধরে নিয়েছি ৭টা ৪৫ মিনিটে। আমার সহকর্মী, সেও দেরী করেছে। সে আমার বাসায় আসল ৬টা ৩০ মিনিটে আর আমরা এয়ারপোর্ট পৌঁছলাম ৭টায়, কিন্তু তখন বোর্ডিং ক্লোজড। উত্তরা থেকে প্লেন মিস করলাম, যাকে বলে মক্কার লোক হজ্জ পায় না!  এই আর কি। তবে এই ভুলের মাসুল দিতে হয়েছে অনেক। দিনের সমস্ত কর্মসূচী কাটছাঁট করতে হয়েছে, কোনটি ঠিক মতো করতে পারিনি, রাতের ফিরতি ফ্লাইট বাতিল করে ট্রেনে আসতে হয়েছে, অনেক আর্থিক দণ্ড দিতে হয়েছে ইত্যাদি, ইত্যাদি। এমন ভুল যেন কেউ না করে আর। বিশেষ করে ঢাকা শহরে সময় নিয়ে কোথাও বের হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ, নতুবা আমাদের মতো বোকা বনতে হবে যে কোনো সময়, সাবধান!

শাহজাহান

৩১ আগস্ট, ২০২৫

উত্তরা, ঢাকা।


Powered by engineers

News & Blog:

Fun, Sports & Family: Axis-Triangle Group Celebrates Annual Get-Together 2026

09/02/2026

Fun, Sports & Family: Axis-Triangle Group Celebrates Annual Get-Togeth...
See More
Triangle Engineers Ltd Signs EPC Contract with Japan’s Tekken Corporation for BIGM Safe Water Supply Project

29/01/2026

Triangle Engineers Ltd Signs EPC Contract with Japan’s Tekken Corpor...
See More
Fire Safety Plan Approval (NOC) in Bangladesh: Requirements, Documents & Approval Process

03/12/2025

Fire Safety Plan Approval (NOC) in Bangladesh: Requirements, Documents...
See More
How to Get Fire Safety NOC in Bangladesh: Approval Process & Professional Support

27/11/2025

How to Get Fire Safety NOC in Bangladesh: Approval Process & Professional Support
See More